গল্পের নাম: Ri part 1: Murder on the ship (#পর্ব_০১)
জনরা: রহস্য, থ্রিলার
"তো গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।লোকটার পরিচয় জানা গেছে?”
“ না।লোকটা একা ছিলো কেউ চিনে না তাকে”
WAVEs A11 জাহাজের ছোট্ট একটা কেবিনে দাঁড়িয়ে ওসি সাহেব আর এই জাহাজের ক্যাপ্টেন মোফাজ্জল হক কথা বলছে।ছোট্ট কেবিনটাতে আরো ৩জন আছে।সাব ইন্সপেক্টর,একজন কন্সটেবল আর চতুর্থ ব্যাক্তিটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
দুইতলাবিশিষ্ট এই জাহাজের নিচতলায় সব কেবিন গুলো পাড় হয়ে একটা সিড়ি পাওয়া যায়। সিড়ি বেয়ে নেমে সোজা সরু করিডোর দিয়ে শেষের দিকে গেলে এই ছোট্ট স্টোররুমের মত কেবিন।
কেবিনে ঢুকে ডানদিকের ফাকা জায়গাটায় একটা চাদর বিছানো। তার উপর একটা মৃতদেহ! হাত পা ছড়ানো, মুখে দাড়ি।কিন্তু সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বেমানান বিষয়টা হবে-বৃদ্ধের বাম চোখের জায়গায় গর্তটা।গুলির বেগ চোখ ও মস্তিষ্ককে ঝাঝড়া করে দিয়ে বেরিয়ে গেছে।ফ্লোরে মগজ আর রক্তের ছিটকে থাকা অংশ দেখেই এটা আন্দাজ করা যায়।
ওসি সাহেব রুমটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষন করছে। কিছু একটা খুজছে সে। পাওয়া গেলনা।পাজলের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ টুকরোটাই মিসিং!ওয়েপন অব দি মার্ডার!
“ লাশ প্রথম কে খুজে পেয়েছিলো?” জিজ্ঞেস করে অফিসার।
ক্যাপ্টেন একমনে ডেডবডির দিকে তাকিয়ে ছিলো। কিছু একটা তাকে বিস্মিত করছে। অফিসারের কথায় সম্ভিত ফিরে পেল।
-“ জি?”
-লাশ প্রথম কে খুজে পায়?
-আমাদের এক নাবিক, নাম আসিফ।কয়েকমাস হয়েছে সে জয়েন করেছে।তার সাথে একজন সাধারণ যাত্রীও ছিলো।পেশায় নার্স।
কিছুক্ষন পরে পাশের একটি কেবিনে তাদেরকে নিয়ে আসা হলো। একটা স্টুলে বসে আছে অফিসার,নার্সকে কন্সটেবল এর সাথে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে নাবিককে বসতে বললেন ওসি।
-“আপনার নাম আসিফ?”
-”জি”. তার চেহারা মলীন। মৃতদেহ আর রক্ত তাকে একটা দু:সপ্নের মাঝে এনে ফেলেছে। আরো একটা কারণ আছে।
- তো আপনি প্রথম দেখতে পেয়েছিলেন তাইতো?
প্রতিউত্তরে আসিফ হ্যা সুচক মাথা নাড়ল।
-”আমাদেরকে কি ব্যাখ্যা করে বলবেন যে কি কি ঘটেছিলো।দয়া করে কিচ্ছু বাদ দিবেন না”
আসিফ চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
খুন হওয়া কক্ষে এই যুবকটিকে কয়েকঘন্টা আগে আরো একবার দেখা যায়। শেষরাতে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে সোজা শেষমাথায় ঐ ছোট্ট কেবিনটার দিকে দুইজন লোক তাড়াহুড়ো করে যাচ্ছিলো। সিড়ির দিক থেকে আসা হালকা আলোতে ওদের চেহারা আবছা দেখা যায়, সাদা পোশাক পড়া দুইজন লোক।দুই নাবিক। কেবিনের দরজার সামনে এসে দাড়াল তারা। কিছু একটা নিয়ে কথা কাটাকাটি করছে।
“আমার কথাটা শুনুন, আমি টিকিট ছাড়া ওই লোককে জাহাজে উঠিয়েছি,কিছু একটা হলে এটা জানাজানি হয়ে যাবে।আর জানেনই তো এসব হলে ওয়েভস কোম্পানি চাকরিতে আর রাখবেনা আমাকে”-
তরুন কন্ঠের লোকটা বলল।
এরপরই কর্কশ কন্ঠটা বলে উঠল, ওই কন্ঠে কর্তৃত্বপরায়নতা আছে, “জানবেনা কেউ কিছু”
“লোকটাকে জাহাজে তুলাতে কিছু টাকা দিয়েছিলো ওই টাকাগুলো আপনি রেখে দেন তবুও এটাকে আর ঘাটিয়েন না প্লিজ”-তরুণ কন্ঠটি মিনতি করে।
“শোন ছোকড়া, তোর ওই কয়টা টাকার পরোয়া আমি করি না। আমার মন বলছে এখানে আমাদের জন্যে বিরাট কিছু আছে।তো আমি যাবোই।আমি যা বলছি তা না করলে আমি নিজে গিয়ে ওয়েভস এর কাছে নালিশ করে আসব তোর নামে।এরপর দেখব কে বাচায় তোর চাকরি।তুই বলেছিস, ওই লোক বৃদ্ধ আর দেখে অনেক অসুস্থ মনে হয়েছে, তারমানে জোরাজুরিও করতে পারবে না।ঝামেলা হওয়ার কোনো কারণ তো দেখছি না আমি”।
তরুণ কন্ঠটা আর আওয়াজ করল না-নিরুপায়। একটা টর্চ জ্বলল।আর কেবিনের দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেল।
তরুন ও মাঝবয়সী নাবিক দুটো কেবিনটিতে ঢোকে। তাদের সামনে মেঝের উপর একটা চাদরে গুটিশুটি মেরে একজন নিস্তেজ বৃদ্ধ শুয়ে আছে।দুই হাত দিয়ে বুকে জড়িয়ে আছে একটা কাপড়ের ছোট্ট ব্যাগ।
আরো ঘন্টা খানেক আগে বন্দরে তরুন নাবিকটির কাছে আসে এই বৃদ্ধ।টিকিট ছিলো না তার কাছে।তবে তরুন নাবিককে মোটা অংকের টাকা দিলে সে বৃদ্ধকে এই কেবিনে নিয়ে আসে।
“এই ব্যাগটা?”
‘হ্যা’'
মাঝবয়েসী নাবিক বৃদ্ধের দুই হাতে জড়িয়ে থাকা ব্যাগের দিকে হাত বাড়ালো
“ দেখি, বুড়ো, তোমার ব্যাগে লুকিয়ে রাখা গুপ্তধন দিয়ে আমাদের কতটা অবাক করতে পার”।
নাবিক ভেবেছিলো কাপড়ের ছোট ব্যাগটা সহজেই টান দিয়ে নিয়ে নিবে।
“সহজ কাজ-”যখন টান দিতে যাবে, হঠাৎ মনে হলো ব্যাগটাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে হাতগুলো। বৃদ্ধের দিকে চাইলো টাকমাথার নাবিক। জেগে উঠেছে বৃদ্ধ। “মরে যাওনি তবে তুমি!”- নাবিক আরো জোড়ে টান দিল, বৃদ্ধ আরো বেশি শক্ত করে ধরল ব্যাগটা। প্রহরী চোখ দুটোএকদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আকস্মিক ছিন্তাইকারীর দিকে। সেই চোখে জেদ। কিছুতেই সে ব্যাগ ছাড়বে না। নাবিকও সর্বশক্তি দিয়ে টানছে। যুবকটিকে উদ্দেশ্য করে বলল-দাড়িয়ে দেখছিস কি! এরপর যুবকটিও হাত লাগালো।
বৃদ্ধ নাছোড়বান্দা। নাছোড়বান্দা হবেই বা না কেন। এই ব্যাগে যা আছে তার জন্যে তাকে কম ঝামেলা পোহাতে হয়নি। জীবন বাজি রেখে এই পর্যন্ত এসেছে সে।বৃদ্ধের পেটের দিকে কাপড় লাল হয়ে আছে।টর্চের আলো পড়েছে সেখানে।রক্তের দাগ। শুকায়নি। তারমানে তাজা ক্ষত আছে। মধ্যবয়স্ক নাবিকের চোখ পড়ল সেখানে। ফ্লোরে বসে দুই হাতে ব্যাগ টানছে আর বাম পা টা বের করে বৃদ্ধের পেটের ওই ক্ষত লক্ষ্য করে লাথি দিল। কোরবানি দেয়া ষাড়ের মত গোঙিয়ে উঠল বৃদ্ধ। আবার একি জায়গায় আঘাত করল নাবিক,আরো জোড়ে।”মর, বেটা”। আবারো। ব্যাগ থেকে হাতের বাধন সরে গেল।ব্যাগটা নাবিকের হাতে চলে এল।
“মরেছে বুড়ো ভাম,বাস্টার্ড”- মধ্যবয়স্ক নাবিকটি কালো কাপড়ের ব্যাগটা নিয়ে দাড়ায়।হাপাচ্ছে সে,“বুড়োর গায়ে জোড় আছে বলতে হবে”। সে ব্যাগের চেইন খুলে ”এখানে কিছু নেই কয়েকটা মোটা পুরোনো কাগজ শুধু” ব্যাগের ভিতর আরো ভালোভাবে দেখলো, একটা মোটা, মাঝারি আকারের চাকতির মত-
“লোহা? ধুর, এসব কি, ছাই!”
গর্দভ।
এগুলো আগের জায়গায় রেখে দিল। এরপর ব্যাগের নিচের চেইনটা খুললো। দুইজনে হা করে আছে। চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে দুজনেরি। “এএএত টাকা” খুশিতে পাগল হয়ে গেছে তারা। ব্যাগ ভর্তি ৫০০ টাকার বান্ডেল।
“গুপ্তধন পেয়ে গেছি রে” খুশিতে বাচ্চাদের কার্টুনের মত লাগছিলো তার চেহারাটা। যুবক তখনো তাকিয়ে আছে টাকার দিকে, ও কথা বলতে পারছে,প্রচন্ড খুশি সে,ভাগ্য খুলে গেছে তার।
তারা ভেবেছিলো এই ব্যাগে যা আছে সেসব তাদের।এমন একজনের সম্পত্তি নিয়ে তারা আত্মহারা হচ্ছিল যাকে নিয়ে তাদের কোনো ধারণাও নেই।
“আল্লার তরফ থেকে এগুলো আমাদের উপহার” চোখ চকচক করছে মধ্যবয়স্ক নাবিকের,রোদে তার টাকটাও এতটা চকচক করে না।
উপহার!
হঠাৎ বিকট চিৎকার করে উঠল মধ্যবয়স্ক নাবিক। আকস্মিক আঘাতে ফ্লোরে পড়ে গেছে।তার কোমড়ের ঠিক উপরের অংশে মেরুদন্ডে ছুড়ি ঢুকিয়ে দিয়েছে বৃদ্ধ।এখনো মরে যায়নি তবে সে!ফ্লোরে বিছানো যে চাদরটার উপর শুয়ে আছে তার নিচে মাথার দিক থেকে সুকৌশলে ছোট্ট ছুরিটা বের করে আঘাত করেছে।আঘাতের পরপরই তরুন নাবিক বৃদ্ধের মাথায় লাথি দেয়, আবারো নিস্তেজ বৃদ্ধ।
যুবক, মধ্যবয়সী নাবিককে ফ্লোরের দেয়ালের কাছে নিয়ে হেলান দিয়ে বসাল। হকচকিয়ে গেছে সে। তার সাথে গত কয়েকমিনিটে যা যা ঘটেছে এসব শুধু সিনেমায় দেখেছে। কখনো কল্পনাও করেনি এমন কিছু ঘটবে।দুইজন মানুষ তার সামনে গুরুতর আহত হয়ে পড়ে আছে। মাঝবয়েসী নাবিকের কোমড়ে এখনো বিধে ছুড়ি আছে। রক্ত বের হচ্ছে। রক্ত! এটা সহ্য করতে পারে না সে। মাথা ঘুরে যায়, বমি আসে।কিচ্ছু চিন্তা করতে পারছে না।শুধু এতটুক বুঝতে পারছে-ছুরিটা বের করা উচিত হবে না তার। রক্তক্ষরণ হয়ে মারা যেতে পারে।
রক্ত! মাথা ঝাকালো, ভাবতে চায় না এসব,ঘামছে ও।
“আমি দেখি ডেকে যাত্রীদের মধ্যে কোনো ডাক্তার বা নার্স পাই কি না”
“আসিফ”-তরুন নাবিক কেবিনের দরজার কাছে যেতেই আহত নাবিক ডাক দেয়, “আগে এটাকে সরা!” ব্যাগটাকে এখন কম গুরুত্বই দিচ্ছে আসিফ।তবু সেটাকে নিয়ে কেবিনের বড় বক্স গুলোর পিছনে রাখল, পরে সরিয়ে নেয়া যাবে।কেবিন থেকে ডেকের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেল আসিফ।
ডেকের যাত্রীদের মধ্যে একজন নার্স পাওয়া গেছে।কিছুক্ষণ পর আসিফ তাকে নিয়ে কেবিনে ঢুকে, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে,মাথা ভো ভো করছে,বুঝতে পারছে মহা বিপদে পড়ে গেছে।কেবিনে ঢুকে একজনকেই দেখতে পায় আসিফ, লম্বা দাড়ি গোফওয়ালা একজন বৃদ্ধ যার দেহ মেঝেতে বিছানো চাদরের উপর চিত হয়ে পড়ে আছে।চোখে গুলির চিহ্ন! ছুড়ির দাগে ভয়ানক চেহারা। টাকাভর্তি কাপড়ের ব্যাগ আর মাঝবয়েসী নাবিকটি নেই!
ইতিমধ্যেই জাহাজের সবাই জেনে গেছে কিছু গুরুতর ঘটে গেছে এই জাহাজে।
চলবে......
✍️তুরাগ

Comments
Post a Comment